আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েলের স্মরণীয় ৫ ইনিংস
খেলা ডেস্ক
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:৫১
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ১৪ বছরের পথচলার অবসান ঘটেছে। ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার এই তারকা অলরাউন্ডার। তবে বিদায়বেলায়ও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে থাকবে তার বিধ্বংসী ব্যাটিং, অবিশ্বাস্য সব শট আর একার হাতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য।
'দ্য বিগ শো' নামে পরিচিত ম্যাক্সওয়েল খেলেছেন ১৪৯টি ওয়ানডে, ১৩০টি টি-টোয়েন্টি ও ৭টি টেস্ট। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জিতেছেন ২০১৫ ও ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তার সংগ্রহ ৩ হাজার ৯৯০ ওয়ানডে রান, ২ হাজার ৮৯৭ টি-টোয়েন্টি রান, ১০টি সেঞ্চুরি ও ১৩৬টি উইকেট।
কখনো বিধ্বংসী ব্যাটিং, কখনো অসম্ভব পরিস্থিতি থেকে দলকে জয় এনে দেওয়া, ম্যাক্সওয়েল বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন বড় মঞ্চে। তার অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংসের মধ্য থেকে আলোচনায় থাকছে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলা পাঁচটি বিশেষ ইনিংস।
২০১*
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের অন্যতম অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী হয়ে থাকবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাক্সওয়েলের সেই দ্বিশতক। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ২৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে একসময় ৯১ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে বসেছিল অস্ট্রেলিয়া। জয় তখন প্রায় হাতের মুঠোয় দেখছিল আফগানিস্তান।
কিন্তু ক্রিজে ছিলেন ম্যাক্সওয়েল। এরপর যা করলেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। তীব্র পেশির টান ও শারীরিক অস্বস্তি নিয়েও থামেননি এই অজি ব্যাটার। একের পর এক আক্রমণে আফগান বোলারদের ছত্রখান করে ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রান করেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ২১টি চার ও ১০টি ছক্কা।
অন্য প্রান্তে প্যাট কামিন্সের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত ৩ উইকেট হাতে রেখে জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। পুরুষদের ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম দ্বিশতক হাঁকানোর পাশাপাশি প্রায় নিশ্চিত পরাজয়কে ঐতিহাসিক জয়ে রূপ দেন ম্যাক্সওয়েল।
১৪৫*
টি-টোয়েন্টিতে ম্যাক্সওয়েলের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের অন্যতম সেরা প্রদর্শনী এসেছিল ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কা সফরে। পাল্লেকেলেতে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমে স্বাগতিক বোলারদের ওপর রীতিমতো তাণ্ডব চালান তিনি।
মাত্র ৬৫ বলে ১৪টি চার ও ৯টি ছক্কায় অপরাজিত ১৪৫ রান করেন এই অজি তারকা। তার ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ৩ উইকেটে ২৬৩ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে অস্ট্রেলিয়া। তখন পুরুষদের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটিই ছিল সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ধারেকাছেও যেতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। ৮৫ রানের বড় জয় পায় সফরকারীরা। ম্যাচের সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। সেই ইনিংসেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, টি-টোয়েন্টিতে কেন তাকে এতটা ভয়ংকর মনে করেন প্রতিপক্ষের বোলাররা।
১০৪*
ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে রান তাড়া করা সব সময়ই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ২০২৩ সালের নভেম্বরে গুয়াহাটিতে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে সেই কঠিন কাজটিই সহজ করে দেখিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। প্রথমে ব্যাট করে ৩ উইকেটে ২২২ রান তুলেছিল ভারত। জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ২২৩।
রান তাড়ায় নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারালেও একপ্রান্তে অবিচল ছিলেন ম্যাক্সওয়েল। তার ব্যাটে ভর করেই ম্যাচে টিকে থাকে অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ৪৮ বলে অপরাজিত ১০৪ রান করেন তিনি। ইনিংসে ছিল আটটি চার ও আটটি ছক্কা। মাত্র ৪৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে অস্ট্রেলিয়াকে পাঁচ উইকেটের জয় এনে দেন এই অলরাউন্ডার।
ম্যাক্সওয়েলের সেই সেঞ্চুরিতে সিরিজে টিকে থাকার আশা বাঁচিয়ে রেখেছিল অস্ট্রেলিয়া। যদিও শেষ পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচের সিরিজ ৪-১ ব্যবধানে জিতে নেয় ভারত। ওই সেঞ্চুরির সুবাদে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ম্যাক্সওয়েলের শতকের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে, যা তখন রোহিত শর্মার সমান ছিল।
১০৮
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের নির্ধারণী ম্যাচে ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটিং ছিল অস্ট্রেলিয়ার জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। ৩০৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৭৩ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে অ্যালেক্স ক্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন ম্যাক্সওয়েল।
দুজনের ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে আসে ২১২ রান। ম্যাক্সওয়েল করেন ১০৮ রান। অন্য প্রান্তে সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে দারুণ সঙ্গ দেন ক্যারিও। তাদের অসাধারণ জুটিতে তিন উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে অস্ট্রেলিয়া। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ নিজেদের করে নেয় সফরকারীরা।
চাপের মুখে দায়িত্ব নিয়ে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ম্যাক্সওয়েলের সামর্থ্যের আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে ইনিংসটি।
১০৪
সাদা বলের ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েলের দাপট ছিল বেশি। তবে লাল বলের ক্রিকেটেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে রাঁচিতে পেয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পরিচিত ধরন থেকে বেরিয়ে ধৈর্যের পরিচয় দেন ম্যাক্সওয়েল।
১৮৫ বলে করেন ১০৪ রান। তার সঙ্গে স্টিভ স্মিথের চতুর্থ উইকেট জুটিতে যোগ হয় ১৯১ রান। এই জুটিই অস্ট্রেলিয়াকে বিপর্যয় সামলে লড়াই করার মতো সংগ্রহ গড়তে সাহায্য করে। সাদা বলের ক্রিকেটে বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত ম্যাক্সওয়েল যে পরিস্থিতি বুঝে নিজের খেলার ধরন বদলাতেও পারতেন, সেই ইনিংস ছিল তারই প্রমাণ।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েলের বিদায় মানে শুধু একজন অলরাউন্ডারের বিদায় নয়, বরং ক্রিকেটের রঙিন মঞ্চের এক বিনোদনদাতার প্রস্থান। অসম্ভবকে সম্ভব করা, কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কিংবা মুহূর্তের মধ্যে বোলারদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া, সবকিছুতেই ছিল তার নিজস্ব ছাপ।