স্পিনের দেশ হয়েও স্পিনে এত দুর্বল বাংলাদেশ!
খেলা ডেস্ক
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:০৫
বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্পিন একসময় ছিল বড় শক্তির নাম। ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘূর্ণিতে কাবু করার পরিচিত কৌশলও ছিল টাইগারদের। অথচ মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই স্পিনই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যে উইকেটে স্পিনারদের ওপর ভরসা করে জয়ের ছক কষেছিল বাংলাদেশ, সেই উইকেটেই ক্যারিবীয় স্পিনারদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন স্বাগতিক ব্যাটাররা। অন্যদিকে বল হাতে প্রতিপক্ষকে বিন্দুমাত্র চাপে ফেলতে পারেননি মিরাজ-তাইজুলরা।
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের প্রধান শক্তি পেসাররা। তবু মিরপুরের উইকেট বিবেচনায় স্পিননির্ভর পরিকল্পনাতেই এগিয়েছিল দল। কিন্তু পরিকল্পনার সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্সের মিল পাওয়া যায়নি। দুই ইনিংসেই ক্যারিবীয় স্পিনারদের ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়েছেন শান্ত-লিটনরা। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে দলকে ঠেলে দিয়েছেন বিপদের মুখে। হৃদয়-তামিমদের উইকেট বিলানোর ধরণ তো বিবেক-বিবেচনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে।
মিরপুরের উইকেটেও ছিল না আগের মতো সেই চেনা কালো মাটির পিচ কিংবা ভয় ধরানো অসমান বাউন্স। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স প্রত্যাশিত ছিল। অথচ একই উইকেটে ক্যারিবীয় ব্যাটাররা দেখিয়েছেন স্পিন মোকাবিলার কার্যকর কৌশল। সুইপ, রিভার্স সুইপ ও ড্রাইভে নিয়মিত রান তুলেছেন তারা। তাইজুলের ফুলার লেন্থের বলও অনায়াসে সামলেছেন। শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

শুধু ব্যাটিং নয়, স্পিন বোলিংয়েও বাংলাদেশের দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট। রোস্টন চেজ, জোমেল ওয়ারিকান ও জশুয়া বিশপ মন্থর উইকেট থেকেও আদায় করেছেন টার্ন ও বাউন্স। লাইন-লেন্থ ঠিক রেখে ব্যাটারদের পরীক্ষা নিয়েছেন। বিপরীতে মিরাজ-তাইজুলদের বোলিংয়ে সেই ধার দেখা যায়নি। কখনো ফুলার লেন্থে বল করে রান দিয়েছেন, আবার খরুচে হয়ে পড়লে বাড়িয়েছেন গতি। তাতেও লাভ হয়নি, বরং প্রতিপক্ষ ব্যাটাররা হাঁকিয়েছেন চার-ছক্কা।
বিশেষ করে চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের স্পিনারদের কাছ থেকে বড় ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল। ১৭০ রানের লক্ষ্য দিয়ে ম্যাচে ফেরার জন্য দ্রুত উইকেট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন মিরাজ ও তাইজুল। তাদের বোলিংয়ে ছিল না ধারাবাহিকতা, ছিল না কার্যকর টার্ন কিংবা ব্যাটারদের চাপে রাখার মতো নিয়ন্ত্রণ। ফলে কঠিন উইকেটেও স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলেছেন ক্যারিবীয়রা।
অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের শুরু থেকেই স্পিনারদের ওপর ভরসা রেখেছিলেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। মিরাজের প্রথম ওভারেই তিনবার জোরালো আবেদনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু আম্পায়ার্স কলে রক্ষা পান ক্যারিবীয় ব্যাটাররা। পুরো ইনিংসে চারবার আম্পায়ার্স কলের সুবিধা পেয়েছে সফরকারীরা। এরপরও স্পিনাররা সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। উইকেটের দেখা পেয়েছেন কেবল পেসাররা। ২১তম ওভারে শরিফুল ইসলাম এবং ২৭তম ওভারে হাসান মাহমুদ সাফল্য এনে দেন।

স্পিননির্ভর উইকেটে বাংলাদেশের পেসাররা দুটি উইকেট তুলে নিতে পারলেও স্পিনারদের ঝুলিতে জমা হয়নি কোনো সাফল্য। তাইজুলের সাম্প্রতিক ফর্মও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কয়েকটি সিরিজ ধরেই নিজের চেনা টেস্ট বোলিংয়ের ছন্দ খুঁজে ফিরছেন তিনি। কার্যকর হার্ড লেন্থের পরিবর্তে ফুলার লেন্থে বেশি বল করে রান বিলিয়েছেন। মিরাজের পারফরম্যান্সেও নেই ধারাবাহিকতা। কখনো ভালো করলেও পরের ম্যাচে সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারছেন না।
স্পিনারদের এত দুরবস্থা বাংলাদেশের জন্য বড় একটি প্রশ্ন রেখে গেল। যে স্পিনকে নিজেদের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে ঘরের মাঠে পরিকল্পনা সাজানো হয়, সেই বিভাগেই কেন এতটা দুর্বলতা? ব্যাটাররা প্রতিপক্ষের স্পিন সামলাতে পারছেন না, বোলাররাও নিজেদের ঘূর্ণিতে প্রতিপক্ষকে আটকাতে ব্যর্থ। ফলে স্পিনের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি থাকলেও মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটের হার সেই দুর্বলতাকেই আরও স্পষ্ট করে দিল।
এমআই