‘বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে’
খেলা ডেস্ক
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:০৯
ক্রিকেট বিশ্বে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ মানেই উত্তাপ। কিন্তু আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঠিক আগে পাকিস্তানের ভারতের বিপক্ষে না খেলার সিদ্ধান্ত সেই উত্তাপকে নিয়ে গেছে নতুন উচ্চতায়। এই সিদ্ধান্তের পেছনের রাজনীতি, সম্ভাব্য প্রভাব ও আইসিসির ভূমিকা। সবকিছু নিয়েই ভারতের নিউজ ১৮ ক্রিকেটনেক্সটের সঙ্গে কথা বলেছেন পাকিস্তানের সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান রশিদ লতিফ। বাংলায় তা তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে না। এই সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
রশিদ লতিফ: এটা পাকিস্তান সরকারের একটা অনেক বড় সিদ্ধান্ত। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে হওয়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের বিপক্ষে খেলবে না। এটাকে একটি প্রতিবাদ মনে করতে পারেন। অথবা অতীতে যা ঘটেছে, সম্ভবত সেটা দেখেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এবং আইসিসিতে বড় পরিবর্তন আসবে। তাদের সিদ্ধান্তগুলোতে হয়তো অনেক পরিবর্তন আসবে। এ নিয়ে অনেক নেগোসিয়েশন হবে। তবে সম্ভবত এই একটি সিদ্ধান্তেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বদলে যেতে পারে।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ-ছয় দিন বাকি। এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত কতটা বিস্ময়কর?
রশিদ লতিফ: আমি মনে করি, এর টাইমিংটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতের বিপক্ষে না খেলার সিদ্ধান্তটি অনেক ভেবেচিন্তেই নেওয়া হয়েছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। কিন্তু এটি সরকারের সিদ্ধান্ত, তাই খবরটি সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকেই এসেছে, ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে নয়।
প্রশ্ন: কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
রশিদ লতিফ: অতীতের দিকে তাকালে দেখবেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হোক বা এশিয়া কাপ, ভারত সব সময় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়েছে আর পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত হাইব্রিড মডেলে রাজি হয়েছে। বছরের পর বছর এটাই হয়ে আসছে। তবে এখন সম্ভবত ভূ-রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। সামনে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এসব নির্বাচনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এসব বিষয়ও তাদের মাথায় থাকে।

খেলার ব্যাপার তো আছেই। তারপর হ্যান্ডশেক নিয়ে যা হয়েছে, সেটাও একটা ব্যাপার ছিল। সেই কাজটা ঠিক হয়নি। খেলা বা না খেলা আলাদা বিষয়, কিন্তু ক্রিকেটের একটা স্পিরিট থাকে, যা কখনো হারানো উচিত নয়। এমনকি ভারতের মানুষজনও সম্ভবত বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। এরপর পাকিস্তান এশিয়া কাপের ট্রফি ফেরত দেয়নি, সেটাও একটা রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপর বাংলাদেশের সঙ্গে যা ঘটেছে, মোস্তাফিজের এপিসোডটির কথাও ধরতে হবে। সে শুধু একজন খেলোয়াড়, কিন্তু তাকে রাজনৈতিক কারণে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় পুরো বাংলাদেশ বোর্ড প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। রাজনীতির বিষয়টিকে আপনি আলাদা করতে পারবেন না, এটা ক্রিকেটের পাশাপাশিই চলছে।
প্রশ্ন: ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনে পাকিস্তানের কি বাংলাদেশের ইস্যুতে জড়ানো উচিত ছিল?
রশিদ লতিফ: হ্যাঁ, অবশ্যই উচিত ছিল। নাজাম শেঠি, জাকা আশরাফ, রমিজ রাজা যার আমলই হোক না কেন, পিসিবি সব সময় পিছিয়েই থাকে। আমরা হাইব্রিড মডেল মেনে নিয়েছিলাম, যার পক্ষে আমি কখনোই ছিলাম না। ২০২৩ সালে পাকিস্তান এই শর্তে ভারতে গিয়েছিল যে ভারত পরে পাকিস্তানে আসবে, কিন্তু সেটা আর ঘটেনি। সম্ভবত এটাই সময় ছিল বাংলাদেশের সাহায্য নেওয়ার বা তাদের পাশে দাঁড়ানোর। বাংলাদেশ একা এই পদক্ষেপ নেয়নি, পাকিস্তান অবশ্যই পেছনে ছিল। ব্যাকডোর ডিপ্লোমেসির মাধ্যমেই কাজ হয়েছে।
প্রশ্ন: এই পরিস্থিতিতে আইসিসি কতটা চাপে পড়বে?
রশিদ লতিফ: পরিস্থিতি না বদলালে আইসিসি বড় ধরনের আর্থিক হুমকির মুখে পড়বে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে এসিসি কীভাবে চলবে? ব্রডকাস্টাররা বিলিয়ন ডলারের চুক্তি বাতিল করতে পারে। তখন সব চাপ আইসিসির ওপরই পড়বে। এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চারবার খেলা হয়েছে। এর সুবিধাভোগী কে ছিল? এসিসি ও আইসিসি।
প্রশ্ন: সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির কথা ভেবে পাকিস্তান কি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে?
রশিদ লতিফ: পাকিস্তানের ক্ষতি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। তবে পাকিস্তানের ক্ষতি হলে আরও অনেক দেশেরও ক্ষতি হবে। আইসিসির বাজেট কমে যাবে। সামনে অনেক লম্বা পথ—২০২৬ নারী বিশ্বকাপ, ২০২৭ বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ভারতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এরপর ২০৩১ সালে বাংলাদেশ–ভারতে বিশ্বকাপ। যদি অনূর্ধ্ব-১৯ বা নারীদের ম্যাচও না হয়, তাহলে ক্রিকেট অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। এসিসির বড় দেশ বলতে ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানই আছে।

প্রশ্ন: গ্রুপ পর্বের ম্যাচ না হলে পাকিস্তানের পথ কতটা সহজ হবে?
রশিদ লতিফ: পাকিস্তান কোয়ালিফাই করবে কি না, সেটা পাকিস্তান ভাবছে না, আইসিসি ভাবছে। পাকিস্তান যদি সুপার এইটে যায় এবং ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ পড়ে আর সেই ম্যাচও না খেলে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তবে আমার মনে হয় পাকিস্তান ঠিকই কোয়ালিফাই করবে। নামিবিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা নেদারল্যান্ডসকে স্পিন ট্র্যাকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে, যদি না বৃষ্টি বাগড়া দেয়। সব মিলিয়ে এটা একধরনের ‘চেকমেট’।
প্রশ্ন: শেষ পর্যন্ত কি বিশ্বকাপে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ হবে?
রশিদ লতিফ: আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হবে। ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ম্যাচটা হবে এবং এর সমাধান হবে ইসলামাবাদ ও দিল্লিতে। কারণ, ব্যবসায়ীরাই খেলাটা চালায়। তাদের প্রভাব অনেক বড়। আইসিসি শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই মেনে নেবে।
এমআই